
নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা মাদারীপুরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলায় মোট ৮ হাজার ১০৬টি বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে, যার বিপরীতে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৫২১টি। অর্থাৎ, মাদারীপুরে মোট বিয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশের সমান বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা:
উপজেলা ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলায় চিত্রটি সবচেয়ে ভয়াবহ। এখানে ২ হাজার ২২৬টি বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদ হয়েছে ২ হাজার ১৭৭টি—যেখানে ব্যবধান মাত্র ৪৯টি। এছাড়া শিবচরে ১ হাজার ২৩৭টি, কালকিনিতে ৯২১টি এবং রাজৈরে ১ হাজার ৯৬টি বিচ্ছেদের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ২০২২ সালে যেখানে বিচ্ছেদের হার ছিল ৪৩.৮ শতাংশ, ২০২৬ সালের শুরুতে এসে তা প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানোকে সমাজের জন্য 'অশনিসংকেত' হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন বাড়ছে বিচ্ছেদ?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আইনজীবী এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে বিচ্ছেদের নেপথ্যে কয়েকটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে:
১. পরকীয়া ও আস্থাহীনতা: জেলা রেজিস্ট্রার আমির হামজার মতে, বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া। স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব সংসার ভাঙার মূলে কাজ করছে।
২. প্রবাস জীবনের দূরত্ব: মাদারীপুর একটি প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। দীর্ঘ সময় স্বামী প্রবাসে থাকায় দম্পতিদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি ও বিচ্ছেদে রূপ নেয়।
৩. বাল্যবিবাহ ও অপরিপক্বতা: ম্যারেজ কনসালটেন্টদের মতে, কম বয়সে বিয়ে এবং মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতি না থাকায় তুচ্ছ ঘটনায় সংসার ভেঙে যাচ্ছে।
৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার: ফেসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সাময়িক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী দাম্পত্য জীবনে কলহ ডেকে আনছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ:
মাদারীপুর জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবীরা বলছেন, বিবাহবিচ্ছেদ আইনি অধিকার হলেও এর হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া সামাজিক কাঠামোর জন্য বড় হুমকি। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে এবং বিচ্ছেদ কমাতে ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
এই বিচ্ছেদের মিছিল কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে এখন গোটা জেলায় চলছে জল্পনা-কল্পনা।