
দিনাজপুর প্রতিনিধি প্রকাশিত: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে তাঁর পৈতৃক শহর দিনাজপুরে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর খবর পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ। প্রিয় ‘পুতুল’কে (খালেদা জিয়ার ডাকনাম) হারিয়ে শোকে স্তব্ধ তাঁর শৈশবের খেলার মাঠ আর প্রিয় শহর।
শৈশবের স্মৃতিধন্য ‘তৈয়বা ভিলা’ দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ি এলাকায় অবস্থিত খালেদা জিয়ার পৈতৃক নিবাস ‘তৈয়বা ভিলা’। এখানে তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের সঙ্গে শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন তিনি। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় খালেদা জিয়াকে এলাকাবাসী আজও সেই চঞ্চল ‘পুতুল’ হিসেবেই মনে রেখেছেন। বর্তমানে এই বাড়িতে একটি বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালিত হলেও ভবনটির দেয়ালজুড়ে আজও যেন তাঁর স্মৃতি লেগে আছে। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে আজ সকাল থেকেই বাড়িটির সামনে ভিড় করেন শত শত মানুষ।
দিনাজপুরের সঙ্গে ছিল আত্মিক টান খালেদা জিয়ার প্রতিবেশী শওকতুল্লাহ বাদশা স্মৃতিচারণা করে বলেন, "তিনি অত্যন্ত মিশুক ছিলেন। যখনই দিনাজপুরে আসতেন, প্রতিবেশীরা ভিড় করতেন আর তিনি সবার কথা মন দিয়ে শুনতেন। সবশেষ ২০১২ সালে গোর-এ-শহীদ ময়দানের জনসভায় তাঁর সেই হাসিমুখ আজও চোখে ভাসে।"
খালেদা জিয়ার খালাতো ভাই আবু তাহের শোকার্ত কণ্ঠে জানান, "আপা ছিলেন আমাদের বটবৃক্ষ। পরিবারের সবার প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক। আজ আমাদের অভিভাবক চলে গেলেন।"
শিক্ষাঙ্গনে শোকের আবহ খালেদা জিয়ার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল দিনাজপুর মিশন স্কুলে। এরপর ১৯৬০ সালে তিনি ভর্তি হন দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক নাজমা ইয়াসমিন বলেন, "বেগম খালেদা জিয়া আমাদের বিদ্যালয়ের গর্ব। তিনি এদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তাঁর শূন্যতা পূরণ হবার নয়।"
রাজনীতির প্রিয় নেত্রী আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৩ আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল খালেদা জিয়ার। গত ২৮ ডিসেম্বর তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্র জমাও দিয়েছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ। জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন বলেন, "গত মাসেই তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি। তাঁর সেই অমায়িক ব্যবহার ভোলার নয়। দিনাজপুরের প্রতিটি ইট-পাথরে তাঁর উন্নয়নের ছোঁয়া রয়েছে।"
সাবেক পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "ম্যাডাম আমাকে স্নেহ করে ‘পাগলা’ বলে ডাকতেন। তিনি বলতেন—জনগণের সঙ্গে থাকাই রাজনীতির বড় শক্তি। আজ আমরা সত্যিকারের অভিভাবকহীন হয়ে পড়লাম।"
দিনাজপুর শহরের জেলমোড় এলাকায় দলীয় কার্যালয়ে সকাল থেকেই কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া মাহফিল চলছে। দিনাজপুরের মানুষের কাছে খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই মাটিরই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যা আজ চিরতরে নিভে গেল।